ভোজ্যতেলের বাজারে ফের অস্থিরতা: সয়াবিনের দাম লিটারে ১৮ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব

ভোজ্যতেলের বাজারে ফের অস্থিরতা: সয়াবিনের দাম লিটারে ১৮ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব

ভোজ্যতেলের বাজারে আবারও অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে। ব্যবসায়ীরা দ্বিতীয় দফায় সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১৮ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন। এর আগে গত বছরের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে ভোজ্য তেলের সংকট দেখা দিলে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর দাবি জানান। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ৯ ডিসেম্বর প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ৮ টাকা বাড়িয়েছিল।

এরপরও বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় রোজার আগে সরকার ভোজ্যতেলের ওপর শুল্ক ও কর ছাড় দেয়। ফলে রমজানের মাঝামাঝি সময়ে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়। তবে, এই ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ব্যবসায়ীরা সয়াবিনের দাম লিটারে ১৮ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ায় ঈদের পর আবারও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভোজ্যতেলের ওপর দেওয়া শুল্ক ও কর ছাড়ের মেয়াদ ৩১ মার্চ শেষ হবে। সরকার এই মেয়াদ বাড়াবে কিনা, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ব্যবসায়ীদের দাম বাড়ানোর ঘোষণায় রহস্য সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন গত বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনকে চিঠি দিয়ে বোতলজাত সয়াবিনের দাম লিটারে ১৮ টাকা এবং খোলা সয়াবিনের দাম লিটারে ১৩ টাকা বাড়ানোর কথা জানিয়েছে। তারা আগামী ১ এপ্রিল থেকে এই দাম কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে।

ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুল্ক ও কর ছাড়ের মেয়াদ বাড়ানো হলে দাম আগের মতোই থাকবে। অন্যথায়, আমদানি খরচ বাড়লে দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, শুল্ক ও কর অব্যাহতির মেয়াদ শেষ হওয়ায় মূল্য সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, আগামী ১ এপ্রিল থেকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিয়ে সয়াবিন ও পাম তেল বাজারজাত করতে হবে। তাই মূল্য সমন্বয় করে পাম ও সয়াবিনের দাম উল্লেখ করা হয়েছে।

সর্বশেষ গত ৯ ডিসেম্বর বোতলজাত সয়াবিনের দাম বাড়ানো হয়েছিল, যা লিটার প্রতি ১৭৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ১ এপ্রিল থেকে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিনের দাম হবে ১৯৩ টাকা। অর্থাৎ লিটারে দাম বাড়ছে ১৮ টাকা। পাঁচ লিটারের বোতলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৩৫ টাকা।

একইভাবে, খোলা সয়াবিন ও খোলা পাম তেলের দাম লিটার প্রতি ১৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বর্তমানে ১৫৭ টাকা। ফলে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম লিটারে ১৩ টাকা বাড়ছে।

রোজার আগে দাম সহনীয় রাখতে সরকার গত বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে কয়েক দফায় ভোজ্যতেল আমদানি, উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট ছাড় দেয়, যার মেয়াদ ছিল ৩১ মার্চ পর্যন্ত। তবে, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন এই শুল্ক-কর ছাড় ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল।

এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এমন পরিস্থিতিতে ঈদের ছুটির আগে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা সরকারকে জানিয়েছে ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের সংগঠন।

নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম স্বপন বলেন, চাহিদার তুলনায় আমদানি কম হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তিন মাস পরপর দাম নির্ধারণ করা উচিত। ১ এপ্রিল থেকে সয়াবিন ও পাম তেল বাজারজাত করার সময় আগের মতোই ভ্যাট দিতে হবে, তাই এই খরচ সমন্বয় করে তেলের নতুন দাম নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ঈদের পর বাজারে আবারও সয়াবিন তেলের কৃত্রিম সংকট দেখা দিতে পারে। ১-২ লিটারের বোতল উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকটের কারণে বাজারে বোতলজাত ভোজ্য তেলের অভাব হতে পারে।

তিনি আরও জানান, কয়েক বছর ধরে এস আলম গ্রুপ ও বসুন্ধরা গ্রুপ দেশের বাজারের মোট চাহিদার ৪০ শতাংশের বেশি ভোজ্য তেল সরবরাহ করত। কিন্তু জুলাইয়ের পর সরকার কঠোর হওয়ায় এই দুটি গ্রুপ উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে, যা বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।

অন্য একটি সূত্র জানায়, এস আলম গ্রুপের কর্ণধার দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েও ব্যবসার অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন, এবং সাম্প্রতিক তেল সংকটের পেছনে তাদের হাত থাকতে পারে।