গণঅভ্যুত্থানের পর স্বস্তির ঈদ: ভিন্ন আমেজে উদযাপন

মনিরুজ্জামান তুহিন:

গণঅভ্যুত্থানের পর স্বস্তির ঈদ: ভিন্ন আমেজে উদযাপন

মাহে রমজানের বিদায় লগ্নে, দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদের আনন্দ। এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতর উদযাপনে প্রস্তুত মুসলিম বিশ্ব, যার অংশ বাংলাদেশও। দেশের আকাশে শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলে কাল ঈদ, না হয় পরশু।

৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান হওয়ায়, এবার ভিন্ন আমেজে ঈদ উদযাপন করবে দেশের মানুষ। রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিরাজ করছে ঈদের এক আনন্দঘন পরিবেশ। জুলাই বিপ্লবের শহীদ পরিবার ও আহতদের মাঝেও ঈদ আনন্দ ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করছে বিভিন্ন মহল।

সোমবার ঈদ হওয়ার সম্ভাবনা ধরে নিয়ে চলছে প্রস্তুতি। চাঁদ দেখার পর বেজে উঠবে কাজী নজরুল ইসলামের সেই গান – ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। ঈদগাহ বা মসজিদে দুই রাকাত নামাজ আদায়ের মাধ্যমে শুরু হবে ঈদ। এরপর ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই কোলাকুলি করবেন।

জাতীয় ঈদগাহে প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে সকাল সাড়ে ৮টায়। প্রতিকূল আবহাওয়ায় জামাত হবে বায়তুল মোকাররমে সকাল ৯টায়। বায়তুল মোকাররমে আরও পাঁচটি জামাত হবে। ঈদ জামাতের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে সারাদেশের ঈদগাহ গুলোকে।

দীর্ঘদিনের কষ্টের পর স্বস্তির পরিবেশে চলছে ঈদের প্রস্তুতি। রমজানে বিদ্যুতের লোডশেডিং ছিল না। চাঁদাবাজি কম ছিল মার্কেটগুলোতে। নিত্যপণ্যের দামও ছিল নিয়ন্ত্রণে। যানজট কমাতে তৎপর ছিল ট্রাফিক পুলিশ। চাকরিজীবীরা সময়মতো বেতন-বোনাস পেয়েছেন। প্রবাসীরাও পাঠিয়েছেন রেকর্ড রেমিট্যান্স। অর্থনীতি চাঙা থাকায় মানুষ স্বস্তিতে কেনাকাটা করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, মার্চের প্রথম ২৬ দিনে ২.৯৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত বছরের চেয়ে ৮২.৪৬ শতাংশ বেশি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঈদের কারণেই রেমিট্যান্স বেড়েছে।

পরিবারের সাথে ঈদ কাটাতে মানুষ ছুটছে গ্রামের দিকে। সরকারি চাকরিজীবীরা ৯ দিনের ছুটি পেয়েছেন, অনেকে নিয়েছেন বাড়তি ছুটি। ঢাকা এখন অনেকটাই ফাঁকা। যাত্রীরা বলছেন, ঈদযাত্রা এবার বেশ স্বস্তিদায়ক। স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরাও পরিবারের সাথে ঈদ উদযাপনে প্রস্তুত।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, সরকারের উদ্যোগের কারণে ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়কারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কোনো নাশকতার হুমকি নেই, জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে কেউ বিশৃঙ্খলা ঘটাতে পারবে না।

নতুন জামা-কাপড় ছাড়া ঈদ উদযাপন যেন অপূর্ণ। তাই শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় ব্যস্ত সবাই। ঘরে ঘরে চলছে সেমাই, পোলাও-কোরমাসহ নানা পদের রান্নার আয়োজন। অনেকে প্রতিবেশীদেরও দাওয়াত দেবেন। ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গরিবদের মাঝে সাহায্য বিতরণ করা হয়। অনেকে জাকাত-ফিতরা আদায় করেন, আবার কেউ দেন নতুন জামা-কাপড় ও খাদ্যসামগ্রী।

রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোও সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করছে। জামায়াতের আমিরের নির্দেশে আওয়ামী দুঃশাসনের শিকার শহীদ পরিবারগুলোর কাছে ঈদ উপহার পাঠানো হয়েছে।

রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও এবার শঙ্কামুক্তভাবে ঈদ উদযাপন করবেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে গণসংযোগের সুযোগ কাজে লাগাতে নেতারা ঈদ করবেন নিজ এলাকায়। তারা এলাকাবাসীর মধ্যে জাকাত বিতরণ করবেন এবং ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন।

তবে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত অনেক মন্ত্রী-এমপি এবার কারাগারে ঈদ করবেন, অনেকে আছেন আত্মগোপনে। ফ্যাসিস্ট আমলে দায়ের করা মামলায় অনেকে এখনো কারারুদ্ধ।

রাজনৈতিক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক প্রফেসর ড. মুহা. হাছানাত আলী বলেন, প্রশাসন দুর্নীতিমুক্ত থাকলে ঈদযাত্রা ও বাজারের কেনাকাটা কতটা স্বস্তিময় হতে পারে, তার উদাহরণ এইবারের ঈদ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দীর্ঘ বন্দিজীবন থেকে মুক্ত পরিবেশে বিএনপি ও সারাদেশের মানুষ এবারের ঈদ উদযাপন করবে।

পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস, তারেক রহমান, ডা. শফিকুর রহমান, মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম, মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ, ড. আহমদ আবদুল কাদের, মাওলানা মামুনুল হক ও মাওলানা জালাল উদ্দীন আহমদসহ বিভিন্ন দলের নেতারা।

জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মাধ্যমে দেশ দ্বিতীয়বার স্বাধীনতা অর্জন করেছে। স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্ত হয়ে মানুষ এখন মুক্ত পরিবেশে শ্বাস নিতে পারছে। তবে বিদেশে পালিয়ে থাকা স্বৈরাচারীরা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তাই দেশবিরোধী অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঈদ র‌্যালি বের করা হবে। উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান র‌্যালিতে নেতৃত্ব দেবেন। এছাড়া ঈদ ঘিরে দেশের বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।