ঈদ: ইসলামের আনন্দ, সংযম ও সাম্যের মহিমান্বিত দিন—

✍️ মুন্তাছির সিয়াম।

ঈদ: ইসলামের আনন্দ, সংযম ও সাম্যের মহিমান্বিত দিন—

জীবনে দুটো জিনিস চিরকালীন সত্য—এক, ঈদ আসবেই, আর দুই, সেই ঈদের দিন মা বলবেই: “এবার একটু কম খা, পেটের অবস্থা তো জানিস!” কিন্তু সত্যি বলতে, ঈদ মানেই তো আনন্দ, আর আনন্দ মানেই পেট পুরে খাওয়া! তবে ঈদের আসল আনন্দ শুধু পোলাও-কোরমা আর সেমাইতে নয়, বরং এটি এক মহৎ ইবাদত ও আল্লাহর অনুগ্রহের প্রকাশ।

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

“আর তোমরা বল, নিশ্চয়ই আমার রবের অনুগ্রহের কারণেই আমি ঈদ উদযাপন করি।” (সূরা ইউনুস: ৫৮)

এই অনুগ্রহ মানে শুধু নতুন জামা-কাপড় বা গিফট নয়, বরং দোস্ত-বন্ধুদের সাথে হেসে-খেলে কাটানো সময়, আত্মীয়দের বাড়িতে গিয়ে বিনামূল্যে মিষ্টির স্বাদ নেওয়া, আর দরজায় দাঁড়িয়ে ‘ঈদ সালামি’র জন্য পিচ্চিদের নিরীহ চাহনি উপভোগ করা!

রমজানের দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর যে আনন্দময় দিনটি আসে, তা হলো ঈদুল ফিতর। এটি কেবল খাদ্য ও পোশাকের আনন্দ নয়, বরং এক মহৎ বিজয়ের দিন। এই দিনে আল্লাহ বান্দাদের গুনাহ ক্ষমা করেন এবং তাঁদের জন্য দয়ার দ্বার খুলে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

“যে ব্যক্তি ঈদের রাতে ইবাদত করে, তার অন্তর কিয়ামতের দিনও জীবিত থাকবে।” (ইবনে মাজাহ)

কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঈদের রাতে ইবাদত করতে গেলে অনেকেরই মনে হয়, “কাল সকালেই তো নামাজ আছে, এখন একটু ঘুমিয়ে নিই!” এদিকে সকালে মা ডেকে বলবে, “ওঠ, ঈদের নামাজ মিস করবি না তো?” আর আপনি ভাববেন, “একটু পরে উঠছি, মা!” কিন্তু যখন উঠে দেখবেন, নামাজ প্রায় শেষ, তখন দৌড়ে যাওয়ার চেষ্টাও বৃথা!

শহরের কোলাহলপূর্ণ ঈদের চেয়ে গ্রামের ঈদ এক অন্যরকম আবেগময়। শহরের বাচ্চারা হয়তো শপিং মলের চকচকে জামায় আনন্দ পায়, কিন্তু গ্রামের ছেলেরা নতুন পাঞ্জাবি পরে এমনভাবে হাঁটে, যেন তারা আজকের দিনের ‘চেয়ারম্যান ক্যান্ডিডেট’! আর ঈদের দিন যে পোলাও-মাংসের ঘ্রাণ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, তা শহরের দামি পারফিউমকেও হার মানায়।

গ্রামের ঈদের সৌন্দর্য দেখা যায় ঈদের নামাজের পর। ছোটরা বড়দের সালাম করে দোয়া নেয়, বয়স্করা মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে গল্প জমায়, আর বাচ্চারা খেলা নিয়ে তর্ক করে—“তোর বল আমার!” ইসলামে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সৌহার্দ্য বজায় রাখাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন:

“যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (সহিহ মুসলিম)

এদিকে ঈদের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত হলো সালামি সংগ্রহ। বাচ্চারা তো সকাল থেকেই হিসাব কষতে বসে, “ফুফা দিবে ১০০, খালু দিবে ২০০, মামা তো কিপটে, ওর কাছ থেকে আশা নেই!” আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, বড়রাও এই সালামির হিসাব করে, তবে উল্টো! “এইবার কারো বাড়ি বেশি বেশি যেতে হবে না, নইলে সালামি দিয়েই পকেট খালি হয়ে যাবে!”

ঈদের আনন্দ মানে শুধু আত্মীয়-স্বজনের সাথে সময় কাটানো নয়, ঈদের মাঠেও চলে নানা রকমের মজার দৃশ্য। কেউ হয়তো নামাজ শেষ করে নতুন জুতা খুঁজে পাচ্ছে না, আর কেউ খুশিতে এতটাই বেহুঁশ যে, ভুল করে অন্যের জুতা পরে বাড়ি চলে গেছে! আর নামাজের পর যে কোলাকুলির মহোৎসব শুরু হয়, তাতেও নাটক কম থাকে না—কেউ বুক মিলিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করছে, আবার কেউ যেন দায়িত্ববোধ থেকে হালকা ছোঁয়া দিয়েই কাজ সেরে নিচ্ছে!

ঈদের দিন কেবল আনন্দের জন্য নয়, এটি আত্মশুদ্ধির এক উপলক্ষ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন:

“তোমাদের কেউ প্রকৃত ঈদ পালন করতে পারবে না, যতক্ষণ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।” (বায়হাকি)

এজন্যই ইসলামে সদকাতুল ফিতর ও কুরবানির বিধান রাখা হয়েছে, যাতে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে। সত্যিকারের ঈদ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন আমরা শুধু নিজেদের নয়, বরং আশেপাশের সবাইকে হাসিখুশি দেখতে পাই। তাই ঈদ শুধু নতুন জামা-কাপড় আর মজার খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি এক মহৎ আনন্দ, যা আল্লাহর ভালোবাসা, রহমত ও সম্প্রীতির মাধ্যমে আমাদের জীবনে পূর্ণতা পায়।

সুতরাং, ঈদের আনন্দ শুধু বাড়ির ভিতর সীমাবদ্ধ না রেখে, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের সাথে ভাগ করে নেওয়া উচিত। মনে রাখবেন, ঈদ মানে শুধু ‘সেলফি আপলোড’ নয়, বরং ঈদ মানে হাসি ভাগ করে নেওয়া, ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়া, এবং আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। ঈদ মোবারক!

✍️ মুন্তাছির সিয়াম।
শিক্ষার্থী,
ডিপার্টমেন্ট: ইসলামিক থিওলজি অ্যান্ড দাওয়াহ।
আল-আজহার ইউনিভার্সিটি, কায়রো, মিশর।