বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় নাম বেগম খালেদা জিয়া। তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান। দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে তিনি নিজেকে কেবল একজন শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেই গড়ে তোলেননি, বরং এক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন।
১৫ আগস্ট দেশের এই প্রবীণ ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ৮২তম জন্মবার্ষিকী। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা প্রতিকূলতা, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও ব্যক্তিগত শোক সহ্য করেও তিনি বিএনপিকে এক সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন।
শৈশব, শিক্ষা ও বৈবাহিক জীবন:
-
জন্ম ও বেড়ে ওঠা: ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন খালেদা জিয়া (ডাকনাম পুতুল)। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে তাঁর পরিবার দিনাজপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
-
শিক্ষাজীবন: দিনাজপুরের সেন্ট জোসেফ কনভেন্ট থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর ১৯৬০ সালে দিনাজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৬৩ সালে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন।
-
বিবাহ ও পারিবারিক জীবন: ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা (পরবর্তীতে শহীদ প্রেসিডেন্ট) জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দুই সন্তান—তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো। দীর্ঘ সময় তিনি একজন সাধারণ ও আদর্শ গৃহবধূ হিসেবেই সন্তানদের লালন-পালন ও পরিবার সামলেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের কঠিন দিনসমূহ:
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সামরিক কর্মকর্তা স্বামী জিয়াউর রহমান দেশের স্বাধীনতার ডাক দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সে সময় সন্তানদের নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন বেগম খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের ২ জুলাই সিদ্ধেশ্বরীর একটি বাসা থেকে সন্তানদেরসহ তাঁকে আটক করে পাকিস্তানি বাহিনী এবং ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত তিনি গৃহবন্দী ছিলেন।
রাজনীতিতে আকস্মিক আগমন ও আপসহীন নেতৃত্ব:
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক মর্মান্তিক সেনা অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। স্বামীর অকাল প্রয়াণে দিকবিদিক হারিয়ে ফেলে দলটি। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে সাবেক সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক শাসন জারি করলে বিএনপির অস্তিত্ব রক্ষায় ও নেতাদের অনুরোধে ১৯৮২ সালে সাধারণ সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন বেগম জিয়া।
-
দলের নেতৃত্ব: ১৯৮৩ সালে ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে তিনি সর্বসম্মতিক্রমে বিএনপির চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন।
-
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন: ১৯৮০-এর দশকে এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা সাত দলীয় জোটের নেতৃত্ব দেন তিনি। রাজপথের লাগাতার আন্দোলনে আপস না করার নীতি তাঁকে দেশের মানুষের কাছে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি দেয়। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন ও অর্জন:
-
প্রথম মেয়াদে সরকার (১৯৯১): ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। তাঁর আমলে দেশে পুনরায় সংসদীয় শাসনব্যবস্থা চালু হয়। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, পোশাক খাতের প্রসার এবং বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়।
-
পরবর্তী মেয়াদসমূহ: ১৯৯৬ সালের সংক্ষিপ্ত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়ে বহুল আলোচিত ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ বিল পাস করান। পরবর্তীতে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর আমলে নারী শিক্ষা ও উপবৃত্তি কর্মসূচি বিশেষ প্রশংসা কুড়ায়।
সংকট, কারাবাস ও শেষ জীবন:
রাজনৈতিক জীবনে বারবার চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত এক-এগারো সরকারের আমলে তাঁকে কড়া নজরদারিতে ও সাবজেলে বন্দী রাখা হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তাঁকে নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কারাগারে বন্দী থাকতে হয়। শারীরিক অসুস্থতা বৃদ্ধি পেলে চিকিৎসকদের পরামর্শে সরকারের অনানুষ্ঠানিক আদেশে তিনি শর্তসাপেক্ষে গৃহে স্থানান্তরিত হন।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আইনি ও রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি মুক্ত হন। দীর্ঘ রোগভোগের পর গত বছর ৩০ ডিসেম্বর তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মৃত্যুর পর তাঁর জৈষ্ঠ্য পুত্র তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান পদে সমাসীন হন এবং তাঁর নেতৃত্বে নির্বাচনে জয়লাভ করে নতুন সরকার গঠিত হয়। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া তাঁর দেশপ্রেম ও আপসহীন লড়াইয়ের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

